দেশে ফ্রিজ ব্যবহার করে ৫৩ শতাংশের বেশি পরিবার

রেফ্রিজারেটরের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে নজর এখন রফতানি সম্প্রসারণে

বিগত এক দশকে দেশের রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ উৎপাদন শিল্পে অভাবনীয় বিপ্লব ঘটেছে। একসময় দেশীয় বাজার পুরোটাই বিদেশী ব্র্যান্ডের দখলে থাকলেও বর্তমানে ৯৫ শতাংশের বেশি বাজার দখলে আছে দেশীয় ফ্রিজের।

দেশীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন, কম্প্রেসার উৎপাদন এবং সাশ্রয়ী মূল্যে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য সরবরাহ করার কারণে স্থানীয় ক্রেতাদের প্রথম পছন্দ দেশী ফ্রিজ। এই শক্তিশালী অবস্থানকে পুঁজি করে এরই মধ্যে রফতানি বাজারে প্রবেশ করেছে দেশীয় ফ্রিজ শিল্প। এখন রফতানির বাজার আরো সম্প্রসারণ করতে চাচ্ছে দেশের ইলেকট্রনিকস কোম্পানিগুলো।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংযোগের বিস্তৃতি, দ্রুত নগরায়ণ ও মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধির কারণেই গত এক-দেড় দশকে ফ্রিজের চাহিদায় উল্লম্ফন ঘটেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকসের সর্বশেষ (২০২৩) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৫৩ শতাংশের বেশি খানা বা পরিবারে এখন ফ্রিজ রয়েছে। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। আর ২০২১ সালে দেশের ৪৫ শতাংশ পরিবারে ফ্রিজ ছিল।

বাংলাদেশ ইলেকট্রনিকস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেমা) বলছে, বর্তমানে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ফ্রিজের ৯৫ শতাংশই দেশীয়ভাবে উৎপাদিত। এ খাতে বছরে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩৫ লাখ ইউনিট, যার প্রায় পুরোটাই দেশীয় ব্র্যান্ডের। বিদেশী পণ্যের চেয়ে তুলনামূলক কম দাম, বিক্রয়োত্তর সেবা ও ওয়ারেন্টি সুবিধা থাকায় দেশীয় পণ্যের দিকেই ঝুঁকছেন ক্রেতারা। আর বৈশ্বিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিক্সডব্লিউ রিসার্চের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ থেকে ২০৩১ সময়কালে প্রতি বছর গড়ে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হবে দেশীয় ফ্রিজের বাজার। সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং মূল্যস্ফীতির প্রবণতা সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধির এ পূর্বাভাস বাংলাদেশের সামগ্রিক সক্ষমতাকে তুলে ধরছে।

দেশের বাজারে পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ইনভার্টার প্রযুক্তির স্মার্ট ফ্রিজের চাহিদা বেশি বলে জানান ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আফছার। প্রতিষ্ঠানটি বাজারে কনকা ফ্রিজ সরবরাহ করছে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে রেফ্রিজারেটরের বাজারে প্রধান ট্রেন্ড হলো পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ইনভার্টার প্রযুক্তির স্মার্ট ফ্রিজের দিকে গ্রাহকের প্রবল আগ্রহ। তারা এমন ফ্রিজ খোঁজেন যা বিদ্যুৎসাশ্রয়ী হবে, দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দেবে এবং দৈনন্দিন জীবনকে আরো সহজ করবে।’

দেশে রেফ্রিজারেটর উৎপাদনে প্রথম উদ্যোগ নেয় দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। এরপর একে একে কনকা, যমুনা, মিনিস্টার, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ভিশন, ট্রান্সকম, ইলেক্ট্রো মার্ট, ওরিয়ন ও র‍্যাংকন কারখানা স্থাপন করে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশে উৎপাদন শুরু করে বিদেশী ব্র্যান্ড স্যামসাং, সিঙ্গার, ওয়ার্লপুলসহ আরো বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড। এখন দেশী-বিদেশী অন্তত ১৩টি কোম্পানি ফ্রিজ উৎপাদন করে বাজারজাত করছে। আর এসব কোম্পানিই দেশীয় চাহিদার প্রায় পুরোটাই সরবরাহ করছে।

দেশীয় বাজারের চাহিদা পূরণ হওয়ার পর এখন কোম্পানিগুলো বিদেশেও ফ্রিজ রফতানি শুরু করেছে। বিশ্ববাজারে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ‘ইনভার্টার’ প্রযুক্তির ফ্রিজের চাহিদা বেশি। দেশীয় কোম্পানিগুলো এখন পরিবেশবান্ধব এবং বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ‘ইনভার্টার’ প্রযুক্তির ফ্রিজ তৈরি করছে। এছাড়া গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করার ফলে বাংলাদেশী প্রকৌশলীরা এখন বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া ও ক্রেতাদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে কাস্টমাইজড ফ্রিজ তৈরি করছেন।

ভারতভিত্তিক বৈশ্বিক বাজার গবেষণা ও পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী রেফ্রিজারেটর (ফ্রিজ) বাজারের আকার ছিল ৭৮ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ৮৩৯ কোটি ডলারের। বর্তমানে এ বাজারের আকার ৮২ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এ খাতে প্রতি বছর গড়ে ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ হারে বাষিক গড় প্রবৃদ্ধি (সিএজিআর) হওয়ার কথা রয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৪ সালের মধ্যে ফ্রিজের বৈশ্বিক বাজার ১৩৯ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রেফ্রিজারেটরসহ স্মার্ট এবং ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ভিত্তিক গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির ক্রমবর্ধমান চাহিদা বাজারের এ প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আজকাল ভোক্তারা এমন স্মার্ট এবং উদ্ভাবনী গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি চান, যা তাদের স্বাচ্ছন্দ্য দেবে এবং ডিভাইসগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের পরিশ্রম কমিয়ে আনবে। পাশাপাশি রেডি-টু-ইট (তাৎক্ষণিক খাওয়ার উপযোগী) স্ন্যাকস, শাকসবজি এবং ফলের মতো হিমায়িত খাদ্যপণ্যের (ফ্রোজেন ফুড) প্রতি ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহও এ পণ্যের চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর বাইরে ই-কমার্স খাতের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিকাশমান বাণিজ্যের কারণেই এ বাজারের প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে আশা করছে ফরচুন বিজনেস।

ফ্রিজের বিশাল এ বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো খুব বেশি না হলেও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের বাজার সম্প্রসারণ করছে। এরই মধ্যে নেপাল, ভুটান, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের ফ্রিজ নিয়মিত রফতানি হচ্ছে। এমনকি ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারেও প্রবেশ করতে শুরু করেছে দেশের তৈরি ফ্রিজ।

ওয়ালটন রেফ্রিজারেটরের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা (সিবিও) মো. তাহসিনুল হক বলেন, ‘আমরা এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ৫০টিরও বেশি দেশে ফ্রিজ রফতানি করছি। গত বছর শ্রীলংকাতেও আমাদের শো-রুম উদ্বোধন হয়েছে। দেশীয় গ্রাহকদের চাহিদা মিটিয়ে আমরা বিদেশে রফতানি করছি। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে আমাদের ফ্রিজ রফতানি প্রায় ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরে আমরা ৫ লাখ ইউনিট ফ্রিজ রফতানির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি।’

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওয়ালটন পণ্যের মোট রপ্তানি মূল্য ছিল ৬২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬২ মার্কিন ডলার (৬.২৪ মিলিয়ন ডলার), যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি।

দেশী ফ্রিজ রফতানির বাজারে প্রবেশ করলেও বাজার সম্প্রসারণে কাঠামো ও নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছেন রফতানিকারকরা। তারা বলছেন, ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন এ খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এছাড়া কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক জটিলতা, লজিস্টিকস খাতের সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোকে। তবে উদ্যোক্তাদের দাবি, বন্দরে দ্রুত ছাড়করণ সুবিধা এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। প্রতিযোগিতাময় বাজারে টিকে থাকতে রফতানি প্রণোদনাসহ এ প্রক্রিয়াকে আরো সহজ করা প্রয়োজন। তাহলে তৈরি পোশাক খাতের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে রফতানি খাতে বৈচিত্র্যায়ণ হবে। এক্ষেত্রে ইলেকট্রনিকস খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

আরও